Logo

করোনা পরিস্থিতিতে মহা সংকটে চা শিল্প

রিপোটার : / ৫৬৯ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২০

image_pdfimage_print

কমলকন্ঠ রিপোর্ট।।

গত বছর রেকর্ড পরিমাণ চা উৎপাদন করেছে বাংলাদেশ। চলতি বছরও উৎপাদন অব্যাহত আছে। কিন্তু চায়ের উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও কমেছে বিক্রি। দেশের বাজারে কমেছে ক্রেতা। করোনা সংকটের কারণের রফতানিও করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে চায়ের পাতা। এতে লোকসানের মুখে পড়েছেন চা ব্যবসায়ীরা। এ পরিস্থিতিতে বাগানের কার্যক্রম সচল রাখার বিষয়টিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে কর্তৃপক্ষ।

চলতি বছর চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সাত কোটি ৫৯লাখ ৪০হাজার কেজি। গত পাঁচ মাসে (মে পর্যন্ত) উৎপাদন হয়েছে এক কোটি ২৮লাখ ৪৬হাজার কেজি। গত বছর প্রথম পাঁচ মাসে উৎপাদন হয়েছিল এক কোটি ৬২লাখ ৮১হাজার কেজি। এ বছর আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন কিছুটা কমেছে। চায়ের উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও থেমে গেছে বিক্রি। এজন্য করোনা সংকটকে দায়ী করছেন এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশে চায়ের বড় ক্রেতা চায়ের টং দোকান এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ। কিন্তু চলতি বছর করোনা সংকটের কারণে দীর্ঘ সময় চায়ের দোকান বন্ধ থাকায় এবং স্বাস্থ্যবিধির ব্যাপারে সচেতন নাগরিকরা বাইরে চা না খাওয়ায় আশঙ্কাজনক হারে কমেছে চায়ের বাজার।

চা ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় চারগুণ কমেছে চা বিক্রি। দীর্ঘদিন অবিক্রীত থাকায় চায়ের মান নষ্ট হচ্ছে।
শীমঙ্গল পদ্মা টি সাপ্লাই স্টোরের পরিচালক কাজল হাজরা বলেন,গত বছরের তুলনায় এ বছর চা বিক্রি চারগুণ কমেছে, কমেছে চায়ের দাম। যে চা আমার ঘরে মজুত আছে তা আরও কিছুদিন থাকলে মান নষ্ট হবে। এতে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবো।
চা বিক্রি করতে না পারলে এর প্রভাব শ্রমিকদের বেতন-ভাতার ওপর পড়বে বলে জানিয়েছেন বাগান মালিকরা। তারা জানান, চা বিক্রি করে যে টাকা আসে তা দিয়েই বাগান চালানো হয়। কিন্তু বর্তমানে টাকা ফেরত আসছে না, অব্যাহত আছে চা উৎপাদন। বিক্রি না করতে পারায় চা রাখার ওয়্যারহাউসগুলো পরিপূর্ণ হয়ে আছে। চা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা আছে।

নাহার চা বাগানের জেনারেল ম্যানেজার পিযুষ কান্তি বলেন, ওয়্যারহাউসগুলোতে (চা রাখার স্থান) চা জমছে, কিন্তু বিক্রি হচ্ছে না। আমাদের ওয়্যারহাউসে জমা আছে প্রায় ৩০ হাজার কেজি চা। আমরা চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছি। চা বিক্রি হচ্ছে না, আবার শ্রমিকদের বেতন বাকি রাখা যাচ্ছে না। তার ওপর চায়ের দাম স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে কম। বর্তমানে ১৫৫ টাকা গড় দামে চা বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশ চা সংসদ সিলেট ভ্যালির সভাপতি জি এম শিবলি দৈনিক মৌমাছি কন্ঠকে বলেন, মহামারী করোনার কারণে চা বিক্রি তিনগুণের বেশি কমেছে। ভালো কোয়ালিটির চা বিক্রি হলেও সাধারণ মানের চা যা সাধারণ চায়ের দোকান বা রেস্তোরাঁয় বিক্রি হয় তা কমেছে। নিলামে যে চা উঠছে তার প্রায় অর্ধেক অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে। ফলে ওয়্যারহাউস গুলোতে চা জমছে। এভাবে আরও কয়েক মাস গেলে চা রাখার জায়গার যেমন অভাব হবে তেমনি নষ্ট হবে চায়ের কোয়ালিটি। এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকতা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় চায়ের উৎপাদন গত বছরের তুলনায় কম হচ্ছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের বিপণন কর্মকর্তা আহসান হাবিব বলেন, গত মৌসুমে (এপ্রিল ২০১৯ থেকে মার্চ ২০২০) চট্টগ্রাম ও শ্রীমঙ্গলের ৪৫টি নিলামে চা বিক্রি হয়েছে ৯০.৪৪ মিলিয়ন কেজি। যার গড় দাম ছিল ১৭৬.০৮ টাকা। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামে ছয়টি এবং শ্রীমঙ্গলে তিনটি নিলাম অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিক্রি হয়েছে ৬.৬৬ মিলিয়ন কেজি। গত বছরের চেয়ে এ বছর চায়ের দামও কমেছে।

তিনি আরো বলেন, নিলামে ক্রেতাদের অংশগ্রহণ কমেছে। তবে ধীরে ধীরে সব কিছু চালু হওয়ায় চায়ের বাজারও একটু একটু করে বাড়ছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

হামিদিয়া চা বাগানের জেনারেল ম্যানেজার মো. সিরাজুল ইসলাম দৈনিক মৌমাছি কন্ঠ বলেন,চা বিক্রি হচ্ছে না,দামও কমেছে। ওয়্যারহাউসে চা জমে আছে। এতে নষ্ট হতে পারে চা এবং চায়ের গুনগত মান। গত বছর আমরা এক লাখ ৮৫হাজার কেজি চা উৎপাদন করেছি। যার দাম ছিল কেজিপ্রতি গড়ে ১৭৬ টাকা। এ বছর গত বছরের চেয়ে চা উৎপাদন অনেকটা কমেছে,সঙ্গে দামও কমেছে। এ বছর গড়ে ১৫৫টাকা করে চা বিক্রি হচ্ছে। তার চেয়ে বড় বিষয় ৬০শতাংশ চা অবিক্রীত থাকছে। আমার বাগানের ওয়্যারহাউসে প্রায় ২৫হাজার কেজির উপড়ে চা জমে আছে,বিক্রি হচ্ছে না। শুধু তাই নয় চা ক্রেতারাদের উপস্থিতিও অনেকটা কমেছে। চা শিল্প চরম সংকটে দিনযাপন করছে ও অনেকটা বাগান বন্ধ হওয়ার উপক্রম। শ্রমিকদের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনাও আরো বাড়ানোরর জন্য নিবেদন করবো।

টি প্লান্টার্স অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টিপিটিএবি) সদস্য সচিব জহর তরফদার বলেন, এ বছর আমাদের শ্রীমঙ্গলের নিলাম কেদ্রে ২০টি নিলাম অনুষ্ঠিত হওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এখন পর্যন্ত তিনটি নিলাম অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ নিলামে ১৮হাজার ৭০০কেজি চা বিক্রি হয়েছে। ক্রেতাদের অংশগ্রহণ কমেছে,সঙ্গে চায়ের দাম কমে গেছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের উপপরিচালক (পরিকল্পনা) মুনির আহমেদ বলেন, ২০২৫সালের মধ্যে ১৪০মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন করার পরিকল্পনা ছিল। সে লক্ষ্যে আমরা সফল ছিলাম। গত তিন বছরে আমদানিনির্ভর চা রফতানিমুখী হয়েছে। চা শিল্প তিন বছরে যে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে গেছিল তা সামনে অনিশ্চিত। কারণ আমরা কেউই জানি না করোনা কতদিন থাকবে।

তিনি আরো বলেন, দেশে চায়ের সবচেয়ে বড় বাজার,পাবলিক প্লেস যেমন- বাজার,স্টেশন,হোটেল বা সব অফিস-আদালত। কিন্তু করোনার কারণে তা বন্ধ। আমার অফিসে প্রতিদিন ৪০-৫০ কাপ চা লাগত এখন লাগে না। এভাবেই গ্রাহক কমায় চা বিক্রি কমে গেছে। নিলামে চা বিক্রির পরিমাণ কমেছে। এতে চা শিল্পের চেইনটাই ভেঙে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ড সূত্রে জানা যায়,১৮৫৪সালে সিলেটের মালনীছড়া চা বাগানে প্রথম বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা চাষ শুরু হয়। দেশ স্বাধীনের সময় দেশে চা বাগানের সংখ্যা ছিল ১৫০টি। তখন তিন কোটি কেজির মতো চা উৎপাদন হতো। বর্তমানে সারাদেশে বিদেশি কোম্পানি,সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ছোটবড় মিলিয়ে চা বাগানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৬টি। এর মধ্যে মৌলভীবাজারে রয়েছে ৯২টি চা বাগান। বাকিগুলো হবিগঞ্জে ২৪টি,সিলেটে ১৯টি,চট্টগ্রামে ২২টি,পঞ্চগড়ে সাতটি,রাঙ্গামাটিতে দুটি ও ঠাকুরগাঁওয়ে একটি। এসব বাগানে মোট জমির পরিমাণ দুই লাখ ৭৯হাজার ৪৩৯ একর।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চায়ের চাহিদা বছরে ৯ কোটি কেজি। ২০১০ সাল থেকে এ চাহিদা পূরণ করতে চা আমদানি শুরু হয়। ২০১৫ সালে সর্বোচ্চ এক কোটি ১৪ লাখ কেজি চা আমদানি হয়। ২০১৬ সালে আট কোটি ৫০ লাখ কেজি রেকর্ড উৎপাদন করে চায়ের চাহিদা পূরণ করে বাংলাদেশ। গত বছর (২০১৯) চা শিল্প ১৬৫ বছরের ইতিহাসে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ চা উৎপাদনের নতুন রেকর্ড গড়ে। সে বছর চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮০ মিলিয়ন বা আট কোটি কেজি চা। বছর শেষে তা পৌঁছে ৯৬.০৭মিলিয়ন কেজি (৯ কোটি ৬০ লাখ ৬৯ হাজার কেজি)। ২০১৮সালে দেশে ৮২.১৩ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন হয়েছিল। ২০২৫সালের মধ্যে দেশে চায়ের উৎপাদন ১৪০মিলিয়নে উন্নীত করতে কাজ করছে চা বোর্ড।


আরো সংবাদ পড়ুন...

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১  
Developed By Radwan Ahmed