1

সঙ্কটে দেশের কাঁচা সোনা -সিলেটের রাবার শিল্প

কমলকন্ঠ রিপোর্ট।। রাবারের গাছ থেকে সংগৃহিত হয় কষ। যা লেটেক্স নামে পরিচিত। সেই কষ প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি হয় রাবার। চার লিটার কষ থেকে তৈরি হয় এক কেজি রাবার। প্রতি কেজি রাবারের উৎপাদনে খরচ পড়ে ৭০ থেকে ৮০ টাকা। আর বিক্রি হয় কেজি প্রতি গড়ে ১০০টাকায়। বিক্রির উপর আবার ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয় বিক্রেতাকে। ফলে লাভের চেয়ে লোকসানই গুণতে হয় বেশি। এমন অবস্থা চলছে গত কয়েকবছর ধরে। অব্যাহত লোকসানের কারণে রাবার চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন বাগান মালিকরা। অনেকেই বাগান বিক্রি ব্যবসা গুটিয়েও নিচ্ছেন।

এমনই একজন মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার আব্দুল মতলিব। বছর তিনেক আগে নিজের রাবার বাগানের গাছ কেটে ফেলেছেন মতলিব। তিনি বলেন, প্রায় ৫ বছর ভর্তুকি দিয়ে বাগান চালু রেখেছিলাম। দাম বাড়ার আশায় ছিলোম। কিন্তু দিন দিন দাম কমছেই। ফলে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। একারণে সব গাছ কেটে বিক্রি করে ফেলেছি। একই উপজেলার বাসিন্দা সুইট খানের রাবার বাগান ছিলো। উৎপাদিত রাবারের দাম না পেয়ে একটি বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি। আরেকটি এখন থাকলেও করোনাসঙ্কট শুরু হওয়ার পর সেটির কার্যক্রম বন্ধ।

সুইট খান বলেন, এখন তো করোনার সময়। সবার অবস্থাই খারাপ। কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায়ও রাবারের দাম পাওয়া যায় না। উৎপাদন খরচও অনেক সময় উঠে না। ফলে এই রাবার বাগান করায় উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন সব চাষীরাই।

সিলেট বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলের রাবার বাগানের উদ্যোক্তাদের সাথে কথা বলে একই ধরণের তথ্য জানা গেছে। সকলেই দাম না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

সিলেট অঞ্চলের বেসরকারি কয়েকটি রাবার বাগানের মালিকরা জানান, ২০১০-১২ সালে রাবারের দাম ছিলো কেজি প্রতি ২৮০-৩২০ টাকা, ২০১৩-২০১৪ সালে এসে দাঁড়ায় ১২০-১৩০ টাকা । বর্তমানে প্রতি কেজি রাবার ১০০-১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

অথচ এককালে ‘সাদা সোনা’ হিসেবে আখ্যায়িত দেওয়া হয়েছিলো রাবার শিল্পকে। ’৮০ দশকে সরকারি তরফে রাবার উৎপাদনে ব্যাপক উৎসাহ প্রদান করা হয়। সেসময় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠে অনেকগুলো রাবার বাগান।

উদ্যোক্তারা বলছেন, বিদেশ থেকে রাবার আমদানি বেড়ে যাওয়ায় দেশে উৎপাদিত রাবারের দাম কমে গেছে। এছাড়া রাবার কাঁচামাল কৃষি পণ্য হওয়া সত্ত্বেও শিল্প পণ্য হিসেবে দেশের বাজারে ভ্যাট দিতে হচ্ছে ১৫ শতাংশ। একারণে আরও বিপাকে পড়েছেন বাগানের উদ্যোক্তারা। লোকসান গুণছে সরকারি বাগানগুলোও।

সরকারের উদাসীনতা, পুরনো চাষ পদ্ধতি এবং শিল্পোদ্যোক্তাদের অনাগ্রহের কারণেও রাবারশিল্পের সঙ্কট ঘণিভূত হয়েছে বলে জানা গেছে।

মৌলভীবাজারের বরমচালের কলিমউল্লা রাবার বাগানের সত্ত্বাধিকারী টিপু চৌধুরী বলেন, ’৯০ সালে আমি বাগান শুরু করি। তখন ২৮০ টাকায় প্রতি কেজি রাবার বিক্রি করেছি। কিন্তু গত ১৫ বছর ধরে রাবারের দাম কমছে। বর্তমানে প্রতি লিটার রাবারের কষ (লেটেক্স) বিক্রি হচ্ছে ২৫ টাকায়। ৪ লিটার কষে এক কেজি রাবার হয়। ফলে এক কেজি রাবার বিক্রি করে দাম পাচ্ছি ১০০ টাকা। এই ব্যবসায় এখন লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি।

সংশ্লিস্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে সরকারি রাবার বাগান ১৮টি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জোনে ৯টি, টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ জোনে ৫টি, সিলেট জোনে ৪টি বাগান রয়েছে। সিলেট অঞ্চলের ভাটেরা, সাতগাঁও, শাহজী বাজার ও রূপাইছড়া বাগানে মোট ৮ হাজার ৪৪২.২২ একর জমিতে রাবার চাষ হয়। এছাড়া সিলেট অঞ্চলে বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন শতাধিক রাবার বাগান রয়েছে। সবমিলিয়ে দেশে প্রায় ৭০ হাজার একর ভূমিতে রাবার চাষ হয়। দেশে বছরে ১৬ থেকে ২০ হাজার টন রাবার উৎপাদন হয়। আর দেশিয় বাজারে এই পণ্যের চাহিদা বছরে ৩০ হাজার টন।

বাগান থেকে সংগ্রহিত কষ সিলেট অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করে রাবারের শিট তৈরি করা হয়। এরপর তা চলে যায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন কারখানায়। রাবার দিয়ে গাড়ির টায়ার, টিউব, জুতার সোল, ফোম, রেক্সিন, হোসপাইপ, গাম, খেলনা সহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি হয়।

এদিকে, সিলেট অঞ্চলের সরকারি বাগানের বেশিরভাগ গাছেরই আয়ুস্কাল ফুরিয়েছে অনেক আগেই। নতুন গাছ আমদানি বা রোপনের উদ্যোগ নেই। এছাড়া বনবিভাগও রাবারবাগানের জন্য নতুন জমি দিতে আগ্রহী নয়। সরকারি বাগানগুলোর প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার রাবার গাছের অর্থনৈতিক জীবনচক্র এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। আয়ুষ্কাল হারানো গাছগুলোর কাঠ আহরণের জন্য শ্রীমঙ্গলে স্থপন করা হয়েছে রাবার কাট প্রেসার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট।

ট্রিটমেন্ট প্লান্ট সূত্রে জানা গেছে, এখানে অর্থনৈতিক জীবনচক্র হারানো রাবার গাছের কাঠকে প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে ব্যবহার উপযোগী টেকসই কাঠে রূপান্তর করা হয়। প্লান্টটি প্রতিদিন ১৬০ ঘনফুট হিসেবে বছরে ৪৮ হাজার ঘনফুট কাঠ প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম।

সরকারি একটি রাবার বাগানের ব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সিলেট জোনের ৪টি সরকারি বাগানই পুরাতন। এসব রাবার বাগানে উৎপাদন ভালো কিন্তু বিক্রয়মূল্য কম হওয়াতে লোকসানের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

রাবার শিল্পের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা বলতে বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন (বাশিউক) রাবার বিভাগ, সিলেট অঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. ওয়লিউর রহমানের সাথে গত ১৬ আগস্ট আলাপ করতে চাইলে তিনি উর্ধতন কর্তৃপক্ষের অনুপতি ছাড়া কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। উর্ধতন কতৃপক্ষের সাথে আলাপ করে তথ্য প্রদান করবেন বলেও জানান তিনি। তবে গত ২৫ আগস্ট ওলিউর রহমান বলেন, আমি উর্ধতন কর্তৃপক্ষের অনুপতি পাইনি। আপনি ঢাকা অফিসে যোগাযোগ করুন।

পরে বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (রাবার) আবু রায়হানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কোনো তথ্য প্রদানে অপরাগতা প্রকাশ করেন।